সরকারি চাকরিতে বদলি ও পদায়ন একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। তবে গণপূর্ত অধিদপ্তরের (পিডব্লিউডি) ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল শাখার প্রকৌশলী মো. শামসুল আরেফিনের কর্মস্থল পরিবর্তন ও বিভিন্ন প্রকল্পে ভূমিকা ঘিরে একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বনামে-বেনামে ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনা, সরকারি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ এবং ঘুষ-কমিশন লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের পাশাপাশি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের বিষয়েও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
ঢাকা ডিভিশন-৬-এ প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
অভিযোগ অনুযায়ী, গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা ডিভিশন-৬-এ কর্মরত থাকাকালে শামসুল আরেফিনের প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী পবিত্র কুমারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি ওই ডিভিশনের একাধিক সরকারি প্রকল্পে প্রভাব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের কেউ কেউ।
প্রকল্পের প্রাক্কলন বা এস্টিমেট তৈরি, কাজের তদারকি থেকে শুরু করে চূড়ান্ত বিল অনুমোদনের বিভিন্ন পর্যায়ে তার প্রভাব ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ঠিকাদারদের দাবি, বিল ছাড়ের বিভিন্ন ধাপে নির্দিষ্ট হারে কমিশন দিতে হতো। দাবিমতো অর্থ না পেলে নথিপত্রে জটিলতা তৈরি করে বিল আটকে রাখার অভিযোগও করেছেন তারা।
এক ঠিকাদারের ভাষ্য, কাজ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে শামসুল আরেফিন বিভিন্ন সময় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম উল্লেখ করতেন। টাকা না দিলে বিল আটকে থাকত বলে দাবি করেন তিনি। অন্য এক ঠিকাদারের অভিযোগ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রাজি আছেন জানিয়ে তার কাছে অর্থ চাওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে কাজ না হওয়া এবং দেওয়া অর্থ ফেরত না পাওয়ার কথাও জানান তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে প্রকৌশলীর বক্তব্য
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকৌশলী মো. শামসুল আরেফিন ‘পরে কথা বলব’ বলে মুঠোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। পরবর্তী সময়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম বলেন, কেউ যদি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নাম ব্যবহার করে ঠিকাদারের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে থাকেন, তবে তার দায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেই নিতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কাউকে এ ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ দেওয়া হয় না। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
বদলি ও পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন
প্রশাসনিক নীতি অনুযায়ী, নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে কর্মকর্তাদের ঢাকার বাইরে বদলির বিধান রয়েছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, শামসুল আরেফিন কর্মজীবনের দীর্ঘ সময় বিভিন্নভাবে ঢাকায় অবস্থান করেছেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে তাকে কুমিল্লায় বদলি করা হলেও প্রায় দেড় বছরের মধ্যে তিনি আবার ঢাকার একই অফিসে সমমানের পদে ফিরে আসেন।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ মহলে আলোচনা রয়েছে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তিনি নিজের কর্মস্থল ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। তবে তার বদলি ও পুনরায় ঢাকায় পদায়নের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম বা আর্থিক লেনদেন হয়েছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ
শামসুল আরেফিনের বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও সামনে এসেছে। অনুসন্ধানী সূত্রের দাবি, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় এবং আবাসন প্রকল্পে তার ও তার নিকটাত্মীয়দের নামে একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লট রয়েছে।
সরকারি চাকরির বেতনের সঙ্গে এসব স্থাবর সম্পত্তির মালিকানার সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে সম্পত্তির মালিকানা, প্রকৃত মূল্য এবং অর্থের উৎস সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধান
দুদকের সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, শামসুল আরেফিনের বিরুদ্ধে স্বনামে-বেনামে ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনা, সরকারি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের বিষয়ে কমিশনের কাছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নথিপত্র তলব করা হচ্ছে বলে সূত্রটি জানিয়েছে। অনুসন্ধানের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
টিআইবির বক্তব্য ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারি প্রকৌশল বিভাগে সিন্ডিকেট ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ নতুন নয়। তবে একই ব্যক্তির বারবার ঢাকায় ফিরে আসা এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর।
তিনি দুদকের অনুসন্ধান স্বাধীনভাবে পরিচালনার সুযোগ দেওয়ার এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। অন্যথায় প্রশাসনিক স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতি অর্থহীন হয়ে পড়তে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী বলেন, অধিদপ্তর কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত অনিয়ম বা দুর্নীতির দায় নেবে না। প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বজায় রাখতে তারা বদ্ধপরিকর। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এলে প্রশাসনিক তদন্তের মাধ্যমে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
তিনি আরও জানান, মো. শামসুল আরেফিনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ এবং তার বদলি-সংক্রান্ত বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দুদকের অনুসন্ধানে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও দাপ্তরিক সহযোগিতা দেওয়া হবে।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাধারণ ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা অভিযোগগুলোর দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। তাদের মতে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্তসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
শামসুল আরেফিনের ঢাকায় প্রত্যাবর্তন, তাকে ঘিরে ওঠা ঠিকাদারি ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ এবং দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধান—সব মিলিয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা ও বদলি-পদায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন। অভিযোগের সত্যতা, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দায় এবং সম্ভাব্য অনিয়মের ব্যাপ্তি নির্ধারণে দুদকের অনুসন্ধান ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রশাসনিক তদন্তের ফলাফলই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।